বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী আসবাবপত্রের মধ্যে “দড়র খাটলা” এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এক সময় এটি শুধু গ্রামীণ বাড়িঘরের এক অনিবার্য অংশ ছিল, কিন্তু এখন এই ঐতিহ্যবাহী খাটলা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে। আধুনিক ডিজাইন ও প্রাচীন সৌন্দর্যের সংমিশ্রণে তৈরি দড়র খাটলা বর্তমানে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু একটি আসবাব নয়, বরং বাংলাদেশের ঐতিহ্য, কারুশিল্প ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

দড়র খাটলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

দড়র খাটলার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। কয়েক শতাব্দী ধরে গ্রামীণ বাংলার ঘরে এই খাটলা ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মূলত কাঠের ফ্রেম ও দড়ির বুনন দিয়ে তৈরি এই খাটলা ঘুম, বিশ্রাম বা বসার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করা হতো। খাটলার দড়ি সাধারণত জুট, খেজুরপাতা বা নলখাগড়ার তৈরি দড়ি দিয়ে বোনা হতো। এতে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল করতে পারত, অন্যদিকে এর ওপর বসা বা শোওয়া ছিল আরামদায়ক।

গ্রামের চায়ের দোকান, পানের দোকান, কিংবা উঠোনে অতিথি আপ্যায়নের জন্য দড়র খাটলা ছিল অপরিহার্য। এটি শুধু একটি আসবাব নয়, বরং গ্রামীণ সমাজের মিলনস্থল ছিল। সন্ধ্যায় গ্রামের মানুষ খাটলার ওপর বসে গল্পগুজব করত, রাজনীতি থেকে কৃষিকাজ—সবকিছু নিয়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই খাটলা।

দড়র খাটলার নতুন রূপ ও ডিজাইন

বর্তমান সময়ে দড়র খাটলার ডিজাইন ও ব্যবহার অনেকটাই বদলে গেছে। আগে যেখানে এটি শুধুমাত্র কাঠ ও দড়ি দিয়ে তৈরি হতো, এখন আধুনিক কারিগররা এতে বিভিন্ন নতুন উপকরণ ব্যবহার করছেন—যেমন স্টিলের ফ্রেম, সিনথেটিক রশি, এমনকি রঙিন প্লাস্টিক কভার। কিছু ক্ষেত্রে দড়ির বুননে শিল্পসম্মত নকশা তৈরি করা হয়, যা খাটলাকে দেয় এক বিশেষ সৌন্দর্য।

দেশের বিভিন্ন হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠান যেমন “বাংলাদেশ হ্যান্ডিক্রাফ্ট বোর্ড”, “আর্তিসানস অব বাংলাদেশ”, কিংবা স্থানীয় উদ্যোক্তারা দড়র খাটলাকে আধুনিক আসবাব হিসেবে নতুনভাবে উপস্থাপন করছেন। বর্তমানে এগুলো শুধু শোবার ঘরেই নয়, বরং রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও অফিসের লাউঞ্জেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দড়র খাটলার চাহিদা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি দড়র খাটলা ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বিপুল সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ঘরে ঐতিহ্যের ছোঁয়া রাখতে এই খাটলা কিনতে আগ্রহী। পাশাপাশি বিদেশিরাও বাংলাদেশের হস্তশিল্প ও প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই খাটলার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন।

পরিবেশবান্ধব ও হাতে তৈরি পণ্যের প্রতি বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ায় দড়র খাটলার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। একেকটি খাটলার দাম বিদেশে ১৫০ থেকে ৪০০ ডলারের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ কারিগরদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

রপ্তানির সাফল্য ও অর্থনৈতিক অবদান

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এবং কিছু বেসরকারি উদ্যোক্তার সহায়তায় এখন অনেক গ্রামীণ প্রতিষ্ঠান বিদেশে দড়র খাটলা রপ্তানি করছে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় যেমন বাড়ছে, তেমনি কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে নারীরা এই কাজে যুক্ত হচ্ছেন, যারা দড়ি তৈরি, বুনন ও রঙের কাজ করেন।

এই খাতে ছোট উদ্যোগগুলো বড় রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম যেমন Etsy, Amazon, বা Daraz Global-এর মাধ্যমে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সরাসরি দড়র খাটলা বিক্রি করছেন।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

যদিও চাহিদা বাড়ছে, তবুও কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো আছে। যেমন, মানসম্মত কাঠের অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা, এবং আন্তর্জাতিক মানে পণ্য প্যাকেজিং ও শিপমেন্টের জটিলতা। তবে সরকার ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে এই খাত দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। হস্তশিল্প মেলার আয়োজন, কারিগর প্রশিক্ষণ এবং রপ্তানি প্রণোদনা প্রদান করলে দড়র খাটলা শিল্প আরও প্রসারিত হবে।

সমাপ্তি কথা

দড়র খাটলা শুধু একটি আসবাব নয়—এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং কারিগর সংস্কৃতির প্রতীক। সময়ের সঙ্গে এর রূপ পাল্টালেও মূল সত্তা একই আছে—সাদামাটা, আরামদায়ক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। আজ যখন এটি বিদেশে বাংলাদেশের গর্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে, তখন এটি শুধু অর্থনৈতিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং একটি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের গল্পও বটে।

বাংলাদেশের কারিগরদের পরিশ্রম, নকশার নতুনত্ব এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা দড়র খাটলাকে করে তুলেছে বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়—আর সেটিই আমাদের জাতীয় গর্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 🇧🇩