সম্প্রতি (২৫ অক্টোবর ২০২৫) জার্মানির গুণড্রেমিংগেন (Gundremmingen) এলাকায় অবস্থিত নিষ্ক্রিয় একটি পারমাণবিক কেন্দ্রে দুইটি বিশাল কুলিং টাওয়ারকে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে — একটি সময়চিহ্নিত আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে পুরনো অবকাঠামো নিরাপদভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই ধ্বংসকর্ম একটি বড় জনসমাগম ও মিডিয়া নজর কাড়ে, কারণ কুলিং টাওয়ারগুলো আকারে এবং কংক্রিটের পরিমাণে বিশাল—মোট করেই প্রায় ৫৬,০০০ টন রিইনফোর্সড কংক্রিট ছিল।
প্রকৌশলী দলের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জটিল। জায়গাটি আগে থেকে বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, নিরাপত্তা অংশগুলো ভেঙে ফেলার জন্য কয়েক হাজার বোরহোল (বোরিং) করা হয়েছে এবং বিস্ফোরকগুলো নির্দিষ্ট ক্রমান্বয়ে স্থাপন করা হয়। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৬০০ কেজি (আনুমানিক অর্ধ টন) বিস্ফোরক ব্যবহার করে এবং প্রায় ১,৮০০টি বোরহোল খুঁড়ে ওই দুইটি টাওয়ার ধসে ফেলা হয় — এই পরিমাপটি কংক্রিটের ভাঙন নিয়ন্ত্রিত করার জন্যই নির্ধারিত ছিল।
কেন কুলিং টাওয়ার ধ্বংস করা হলো? জার্মানি ২০১১ সালে পারমাণবিক বিদ্যুৎ নির্গমন নীতির (nuclear phase-out) সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে পুরনো কেন্দ্রগুলোর ডিজঅ্যাসেম্বলি বা ধ্বংসকর্ম ধাপে ধাপে করা হচ্ছে। গুণড্রেমিংগেনের টাওয়ারগুলো আর ব্যবহারের নয়; তাদের অবস্থা ও নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়াই সিদ্ধান্ত ছিল। ধ্বংসকর্মটি একটি পরিকল্পিত পরিবেশগত ও নিরাপত্তা প্রক্রিয়ার অংশ, যাতে ভবিষ্যতে জায়গাটি রিসাইক্লিং ও পুনর্ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে।
ধ্বংসের সময় নিরাপত্তা ও পরিবেশগত সতর্কতা সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ ছিল। ধৰা ছিল—উত্পন্ন ধূলিকণা, ধ্বংসাবশেষের রিকোয়েকিং, আশপাশের মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের উপর প্রভাব ইত্যাদি। তাই বিস্ফোরণের আগেই আশপাশের এলাকায় জনসাধারণকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া, দূরত্ব সীমা নির্ধারণ করা এবং পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা দিয়ে ইভেন্ট লাইভ স্ট্রিমিং করা হয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংসকালের ঝাঁকুনির তীব্রতা কমাতে কংক্রিটের ভাঙা অংশ পুনরায় সংগ্রহ করে পুনঃব্যবহারের পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ভিডিও ফুটেজ থেকে দেখা গেছে লোকজন নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে উক্ত ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছে।
এই ধরনের নিয়ন্ত্রিত ধ্বংসকাজের প্রযুক্তি ও বাস্তবায়ন অত্যন্ত বিশেষায়িত। ডেমোলিশন কোম্পানিগুলো প্রথমে স্ট্রাকচারাল মডেলিং করে কোন বিন্দুতে বিস্ফোরণ দিলে কাঠামো চাইতেমতো ভাঁজ হবে তা হিসাব করে—এর জন্য কংক্রিটে বোরহোল খুঁড়ে সেগুলোতে চার্জ বসানো লাগে। বিস্ফোরণ একেবারেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে করলে আশপাশে বিপুল ক্ষতি হতে পারে—তাই শক-অ্যাবজর্পশন, ধূলিকণার নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পুনর্ব্যবহার পরিকল্পনা সবই অপরিহার্য। বিশ্বজুড়ে এই ধরনের ধ্বংসকাজ বেশ জটিল ইঞ্জিনিয়ারিং অপারেশন হিসাবে ধরা হয়।
কী শিক্ষা পাওয়া গেল এবং ভবিষ্যৎ করণীয়—প্রথমত, পুরনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল অবকাঠামোর সংস্কার বা অপসারণে স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও স্থানীয় জনসাধারণের নিরাপত্তা প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, ধ্বংসকাজগুলো পরিবেশগত প্রভাব—বিশেষত ধূলিকণা ও শব্দ দূষণ—নিয়ন্ত্রণ করে করা দরকার। তৃতীয়ত, পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ আলাদা করে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা হলে খরচও কমে এবং পরিবেশগত লাভও পাওয়া যায়। গুণড্রেমিংগেনের ক্ষেত্রে ধ্বংসকর্মের পরে কংক্রিট ও কাণ্ডভাঙা কুড়িয়ে নেয়া ও রিসাইক্লিংয়ের কথাও মিডিয়ায় উল্লেখ হয়েছে।
সংক্ষিপ্তভাবে বলা যায়—৬০০ কেজি বিস্ফোরক ব্যবহার করে কুলিং টাওয়ার ধ্বংস করা একটি উচ্চ-নিপুণতা সম্পন্ন, পরিকল্পিত ও নিরাপত্তাভিত্তিক অপারেশন ছিল। এটিকে শুধুই ‘দৃশ্যমান বিস্ফোরণ’ হিসেবে দেখা উচিত নয়; বরং এটি ইঙ্গিত করে কিভাবে বিশাল শিল্প অবকাঠামোকে সেফলি রিটায়ার করা যায়—যেখানে প্রযুক্তি, জনসুরক্ষা ও পরিবেশীয় বিবেচনা সবকিছুই সমান্তরালভাবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক সূত্রে পাওয়া প্রতিবেদন ও ভিডিও ফুটেজ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।