সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ইস্কন (ISKCON) নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা সামাজিক ও ধর্মীয় পরিসরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। একদিকে অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ তুলেছেন যে ইস্কনের কিছু কার্যক্রম দেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক; অন্যদিকে, অন্য একটি অংশ বলছে এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। ফলে এই বিষয়টি এখন শুধুমাত্র ধর্মীয় বিতর্ক নয়, বরং এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসনের প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।

ইস্কন কী এবং তাদের কার্যক্রম

ইস্কন বা International Society for Krishna Consciousness হলো একটি আন্তর্জাতিক ধর্মীয় সংগঠন, যা ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই সংগঠনটি মূলত শ্রীকৃষ্ণভক্তি ও ভাগবত গীতার প্রচার করে থাকে। বাংলাদেশেও ইস্কনের বেশ কয়েকটি মন্দির, শিক্ষাকেন্দ্র ও মানবসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তাদের প্রধান কাজ হলো ধর্মীয় উপাসনা, দান-খয়রাত, ভক্তিমূলক গান-নাচ এবং নিরামিষভোজ প্রচার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইস্কনের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে ধর্মীয় উস্কানি, জমি দখল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরির অভিযোগ উঠেছে।

বিক্ষোভের সূচনা ও দাবিগুলো

বিক্ষোভকারীরা দাবি করছেন, ইস্কনের কিছু কার্যক্রম দেশে ধর্মীয় সম্প্রীতির পরিপন্থী। তারা অভিযোগ করেন, সংগঠনটি সাধারণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নামে বিদেশি সংস্কৃতি প্রচার করছে এবং সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে।

রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা “ইস্কন নিষিদ্ধ করো”, “ধর্মীয় শান্তি বজায় রাখো” ইত্যাদি স্লোগান দেন। তাদের বক্তব্য—বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও এখানে কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী যদি সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক

ইস্কনের পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ইস্কন সর্বদা অহিংসা, সহনশীলতা ও ভক্তিপূর্ণ জীবনের প্রচার করে এবং কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নয়। তাদের মতে, কিছু মহল ইস্কনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে ধর্মীয় বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে।

ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বোঝাপড়া ও সংলাপের অভাবই এমন বিক্ষোভের মূল কারণ। তারা মনে করেন, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে গুজব বা উগ্র বক্তব্য ছড়ালে তা দেশের সামাজিক সম্প্রীতিতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা

বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশের উপস্থিতি ছিল ঘনিষ্ঠ। বেশ কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। পুলিশ জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড বা সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।

সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, কেউ যদি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে—সে ইস্কন হোক বা অন্য কোনো সংগঠন।

ধর্মীয় সহনশীলতার গুরুত্ব

বাংলাদেশ একটি বহুধর্মাবলম্বী সমাজ, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে। তাই কোনো ধর্মীয় সংগঠনের কর্মকাণ্ড যদি বিতর্ক সৃষ্টি করে, তার সমাধান হওয়া উচিত আইনি ও সংলাপের মাধ্যমে, সংঘাতের মাধ্যমে নয়।

ধর্মীয় সহনশীলতা বজায় রাখতে হলে আমাদের প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বোঝাপড়া এবং ভুল ধারণা দূর করার প্রচেষ্টা।

শেষ কথা

ইস্কন নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ আমাদের সমাজে ধর্মীয় সচেতনতা ও সহনশীলতার সীমা কোথায়—সেই প্রশ্ন তুলেছে। একদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা জরুরি, অন্যদিকে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে যেন কেউ সেই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি না করে।

এখন প্রয়োজন উভয় পক্ষের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা, তথ্যভিত্তিক তদন্ত ও সামাজিক ঐক্যের প্রচেষ্টা।

কারণ, কোনো ধর্মই বিভাজন শেখায় না—সব ধর্মের মূল শিক্ষা হলো শান্তি, সহনশীলতা ও মানবতা।

যদি আমরা এই মূল্যবোধগুলো ধারণ করতে পারি, তবে এমন বিক্ষোভ আর সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না, বরং একটি শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, যেখানে সবাই সমানভাবে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারবে।